বর্তমান সময়ে শিশু নির্যাতন, অপহরণ, ও যৌন হয়রানির মতো ঘটনা বেড়েই চলেছে, যা যেকোনো অভিভাবকের জন্যই অত্যন্ত চিন্তার বিষয়। একজন সচেতন বাবা-মা হিসেবে আপনার প্রথম লক্ষ্য থাকে সন্তানকে সুরক্ষিত রাখা। তাই বিপদ ঘটার আগেই সন্তানকে ভালো স্পর্শ (Good Touch) এবং খারাপ স্পর্শ (Bad Touch) সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
ছোটদের সাথে এসব বিষয় নিয়ে খোলাখুলি কথা বলার সুযোগ তৈরি করতে হবে। অনেক অভিভাবক মনে করেন, সন্তান এখনো ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝার মতো বড় হয়নি। কিন্তু বিষয়টি মোটেও তা নয়। ছোটবেলা থেকেই তাদের এই বিষয়ে খুব সহজে বোঝানো সম্ভব, যাতে তারা ভয় না পেয়ে বিষয়টি সঠিকভাবে জানতে পারে। এই নিবন্ধটি আপনাকে আপনার সন্তানকে ভালো ও খারাপ স্পর্শের পার্থক্য বোঝাতে সাহায্য করবে।
১. গুড টাচ ও ব্যাড টাচ সম্পর্কে কথা বলুন
সন্তানকে বিভিন্ন ধরনের স্পর্শ সম্পর্কে বলুন। যেমন— যে স্পর্শ আদরের ও ভালো লাগার অনুভূতি দেয়, সেটি ভালো স্পর্শ (যেমন: মাথায় বা পিঠে হাত বোলানো, স্নেহের কোলাকুলি)। অন্যদিকে, যে স্পর্শে শারীরিক কষ্ট হয় কিংবা মনে অস্বস্তি তৈরি হয়, সেটি খারাপ স্পর্শ (যেমন: চিমটি কাটা, মারা কিংবা শরীরের কোনো স্পর্শকাতর স্থানে হাত দেওয়া)। সন্তানকে পরিষ্কার জানিয়ে দিন যে, স্পর্শটি যদি বন্ধু বা পরিবারের কোনো সদস্যের থেকেও আসে এবং তা যদি তার ভালো না লাগে, তবে সরাসরি “না” বলার সম্পূর্ণ অধিকার তার আছে।
২. সুইমসুট রুল (Swimsuit Rule) শেখান
ছোট শিশুদের খুব সহজে খারাপ স্পর্শ বোঝানোর জন্য এটি একটি চমৎকার নিয়ম। সন্তানকে বুঝিয়ে বলুন, সুইমসুট বা অন্তর্বাস দিয়ে শরীরের যে অংশগুলো ঢাকা থাকে, সেগুলো তার ব্যক্তিগত বা গোপন অঙ্গ। সে নিজে ছাড়া অন্য কেউ এই অংশে হাত দিতে বা দেখতে পারবে না। এতে করে কেউ ভুল উদ্দেশ্যে স্পর্শ করলে সে সহজেই তা বুঝতে পারবে এবং প্রতিবাদ করতে পারবে। তবে যেকোনো ধরনের অস্বস্তিকর স্পর্শের কথা যেন সে আপনাকে জানায়, সেই জোর তাগিদ দিন।
৩. বিষয়টিতে লজ্জা পাবেন না
শরীরের সুরক্ষা ও স্পর্শ সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো সংশয় না রেখে স্পষ্ট করে কথা বলা দরকার। যদিও বিষয়টি স্পর্শকাতর, তবুও মনে রাখবেন— আপনার থেকেই সন্তান প্রথম শিখবে। ঘটে যাওয়া কোনো উদাহরণের মাধ্যমে গল্প বানিয়ে খুব সহজ ও আকর্ষণীয়ভাবে বিষয়গুলো তাকে বুঝিয়ে বলুন।
৪. নিজের শরীরের মালিকানা শেখান
সন্তানকে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করুন এবং প্রয়োজনে জোরে “না” বলতে শেখান। তার নিজের শরীর যে তারই নিয়ন্ত্রণে, সেই আত্মবিশ্বাস জোগান। তার ইচ্ছা না থাকলে সে কাউকে করমর্দন (Handshake), কোলাকুলি বা কোনো শারীরিক স্পর্শ করতে অস্বীকার করতে পারে। এছাড়া তার অনুমতি ছাড়া কেউ যেন তার ছবি তুলতে না পারে, সে বিষয়েও সচেতন করুন।
৫. সঠিক পরিভাষা ব্যবহার করুন
অনেক সময় বাবা-মা শরীরের স্পর্শকাতর অঙ্গের কথা বলতে গিয়ে নানা ধরনের সাংকেতিক নাম বা ডাকনাম ব্যবহার করেন, যা একদমই ঠিক নয়। শরীরের গোপন অঙ্গগুলোর জন্য সঠিক অঙ্গ ব্যবচ্ছেদ সংক্রান্ত নাম ব্যবহার করুন। সঠিক শব্দ ব্যবহার করলে সন্তান বিষয়টি সঠিকভাবে বুঝতে পারবে এবং কখনো কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে আপনাকে তা স্পষ্টভাবে বলতে পারবে।
৬. প্রতিবাদ করতে শেখান
আমরা সাধারণত সন্তানদের সবসময় ভদ্র, নম্র ও শান্ত থাকার শিক্ষা দিই। কিন্তু অচেনা বা অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে তাদের চুপ না থেকে প্রতিবাদ করতে শেখান। খারাপ পরিস্থিতি টের পেলে জোরে চিৎকার করে সাহায্য চাইতে বলুন। সন্তান যেন কোনো অপরিচিত জায়গায় একা না যায় এবং আপনার বিশ্বাসযোগ্য কোনো মানুষের সঙ্গেই যেন থাকে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকুন।
৭. কোনো স্পর্শ জোর করে চাপিয়ে দেবেন না
সন্তানকে জড়িয়ে ধরা বা চুমু খাওয়ার আগেও তার অনুমতি নিন। তাকে বোঝান যে তার শরীরের ওপর কেবল তার নিজেরই নিয়ন্ত্রণ আছে। শিশু যেকোনো সময় যেকোনো কারণে অস্বস্তি বোধ করতেই পারে, তাই তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে কাউকে জড়িয়ে ধরতে বা চুমু দিতে বাধ্য করবেন না। যেমন: “ফুফুকে গিয়ে জড়িয়ে ধরো”— না বলে বলুন “ফুফুকে হাই বলো” বা “হ্যান্ডশেক করো”।
৮. সন্তানের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানান
যেকোনো কারণে কারো স্নেহ বা আদর প্রত্যাখ্যান করলে সন্তান যেন নিজেকে অপরাধী না ভাবে। আপনার সন্তানকে শেখান যে তার শরীরের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তার নিজের অনুভূতি ও সিদ্ধান্তই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটি তাকে তার নিজস্ব সিদ্ধান্তকে সম্মান করতে শেখাবে।
৯. আলোচনা চালু রাখুন
সন্তান যত বড় হবে, মিডিয়া ও সহপাঠীদের সংস্পর্শে এসে শরীরের সুরক্ষা সম্পর্কে তার ধারণা বদলাতে থাকবে। তাই এই বিষয়গুলো মাঝেমধ্যেই তার সাথে পুনারালোচনা করুন এবং তার মনে আসা যেকোনো প্রশ্নের উত্তর সহজভাবে দিন।
শেষ কথা
পৃথিবীর ভালো ও মন্দের তফাত সন্তানকে শেখানো প্রতিটি অভিভাবকেরই প্রধান দায়িত্ব। যদি কখনো দেখেন সন্তান হঠাৎ পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে, মনমরা হয়ে থাকছে, হঠাৎ করে আবার বিছানায় প্রস্রাব করা বা আঙুল চোষার মতো আচরণ করছে— তবে তাকে সন্দেহ না করে ভালোবেসে তার সাথে কথা বলুন। শান্ত থাকুন এবং মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনুন।